Friday, September 14, 2018

ধারাবাহিক গদ্য- চন্দন ঘোষ










চিকিৎ"শকিং" ডায়েরিঃ শ্রীনগরের সুনীল আকাশ


সিঁদুর মাখানো বটগাছটার ঝুপসি অন্ধকারে সাইকেল নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সৌম্য। সাতসকালে আকাশ একেবারে ভেঙে পড়েছে। আজ আর হেলথ সেন্টারে পৌঁছনো যাবে কিনা জানে না সে। সদ্য সদ্য সাইকেল চালানো শিখেছে। তার ওপর এই খোয়া ফেলা রাস্তা। আর নৈবেদ্যে কাঁঠালি কলা এই বিড়ালে-কুকুরে বৃষ্টি। এক হাতে ছাতা বাগিয়ে সাইকেল চালানো তার পক্ষে অসম্ভব। তাই এইভাবে ভেজা ছাড়া আর গতি নেই।

মাত্র পনেরো দিন চিত্তরঞ্জনে রেলের চাকরি করে একরকম পালিয়ে এসেছিল সৌম্য। ওই রেলের চাকরির ঔপনিবেশিক আদব-কায়দায় অতিষ্ট হয়ে গেছিল সে। কিন্তু তার ধারণা ছিল না, হেলথ সার্ভিসের চাকরি করতে এসে একেবারে কড়াই থেকে উনুনে এসে পড়বে। বারাসাত থেকে বহরমপুর এক্সপ্রেসে চাকদা, সেখান থেকে লোকাল বাসে বেলিয়া বাজার। তারপর এবড়োখেবড়ো রাস্তায় তিন কিলোমিটার ভ্যান বা সাইকেল। সাইকেল চালানো জানত না প্রথম প্রথম। ভ্যানের ঝাঁকুনিতে কোমর যায় যায় অবস্থা। অবশেষে সেকেণ্ড হ্যান্ড একটা সাইকেল দেড়শ টাকায় কিনে সাইকেল শেখা এই রাস্তাতেই। জয়েনিং-এর দিন লোকাল এম এল এ আর তার দলবল হাইজ্যাক করে তাকে। সাত বছর ডাক্তার নেই হেলথ সেন্টারে। হাসপাতালের শ্রীগণেশ করতেই হবে। একে তো ছাড়া চলবে না। সে ডেলিপ্যাসেঞ্জারিই সই।

চার দিকে ধু ধু মাঠ। আর দেড় মানুষ উঁচু পাট ক্ষেত। মাঝখানে আধভাঙা এক বাড়ী। সেখানে প্রথম দিনই ঘেরাও হল সৌম্য। একদল লোক, সব সিপিএম, ঘিরে ধরে বলতে লাগল, আপনার এই রেজিষ্টার জাল। এই সেন্টারে পুকুরচুরি হচ্ছে। ভিড়টার দিকে একবার তাকিয়ে সৌম্য ভাবল একটা হেস্তনেস্ত করতে হচ্ছে। যা হয় হবে। সে বলল, আপনারাই ঠিক বলছেন। ঠিক আছে, পুলিশ ফাঁড়িতে চলে যান। ওখানে গিয়ে কমপ্লেন করুন, হেলথসেন্টারে একজন ডাক্তার এসেছে, সে চোর। আর আমাকে ওরা ধরে নিয়ে জেলে পুরে দিক। এই শুনে ওরা যেন পুরো ব্যোমকে গেল। একদল বলল, আরে ডাক্তারবাবু এত রেগে গেলে চলে। তারা আবার অন্যদের ধমক দিয়ে থামাল। তারপর একটু এনকোয়ারি করে দেখবেন, স্যার, বলে হাতফাত মিলিয়ে চলে গেল। তারপর কতদিন যে চলে গেল এই শ্রীনগর হেলথ সেন্টারে।

এইসব সাত পাঁচ ভাবছিল সৌম্য। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বলে উঠল, দাদাবাবু এখেনে ভিজতিছ কেন? চল ইখুনি। কাছেই একটা সাঁওতাল পাড়া আছে। সুনীলদের বাড়ির খুব কাছেই এসে সে যে দাঁড়িয়েছে তা সৌম্যর খেয়াল ছিল না। সুনীল ওর কাছে মাঝেমাঝেই আসে। ভ্যান চালায়। লোকাল ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে বলে সৌম্যই ওর ব্যাঙ্ক লোনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সে লোন শোধ করে নতুন লোন নিয়ে ধীরে ধীরে ও চারখানা ভ্যান করেছে। চারভাই চালায়।

 সুনীলদের বাড়ি এসে সৌম্য একটা বড়ো চালার নিচে আশ্রয় পেল। দেখে আগুনের মধ্যে সিঁক দিয়ে কী একটা পোড়ানো হচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিল মুরগী, পরে বুঝল ওটা একটা ধেড়ে ইঁদুর। ওরা এসব খায়। পান্তা ভাত, লঙ্কা, নুন, তেল সব রেডি। সৌম্যর একটু গা গুলিয়ে ওঠে। সুনীল এসে একগাল হেসে বলে, দাদাবাবু একটু চা খাবি। সৌম্য না করে। একটু ইতস্তত করে সুনীল বলে, দাদাবাবু, একটু অসুবিধেয় পড়ে গিছি। তাই তোর টাকাগুলো এখুনি দিতি পারছি না। সৌম্যর মনে পড়ে মার অসুখের সময় সুনীল কিছু টাকা নিয়েছিল। সৌম্য মনেমনে প্রায় সত্ত্ব ত্যাগ করেই টাকাগুলো দিয়েছিল। তার প্রায় মনেই ছিল না টাকার কথা। সুনীল কিন্তু ভোলেনি। এরপর সুনীল প্যান্টের পকেট থেকে একটা খবরের কাগজের মোড়কে কী একটা বার করে আনে। বলে, দাদাবাবু এটা তুই রাখ ইখন। পরে টাকা হলে আমি ফেরত নিব। এ কিন্তু চুরিচামারির মাল না। আমার মায়ের বাপ আমাকে দিছিল অন্নপ্রাশনে। দেখ, দেখ আমার নাম লিখা আছে এখেনে। সৌম্য দেখে একটা বড়ো রূপোর তাবিজ, উপরে নাম লেখা "খোকা"। 

  সৌম্যর থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। কোনো কথা সরছে না মুখ দিয়ে। বাইরে বৃষ্টি ক্রমশ ধরে আসছে। পৃথিবীতে খুব তাপ জমেছিল। সুনীলরা বৃষ্টি হয়ে সেই তাপ যেন মুছে দিয়েছে আজ।

ধারাবাহিক গদ্য- দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়







ভালোবাসাগুলো সেলিব্রিটি হয়ে...যায়নি


স্মার্টফোনের জমানায় গল্প বলার ধারণা বদলেছে। স্টোরি টেলিং এর সাম্প্রতিক সংযোজন মেম। গোত্রে গ্রাফিক নভেল বা কমিক্সের খুব কাছে হলেও, মেম স্বতন্ত্র। পপুলার এপ্রোচে বানানো মেমগুলি চটুল মজায় বলে দেয় জীবনের রাজনীতি। যেহেতু কালচারের বোঝা এখানে নেই, তাই সরাসরি ধাক্কা লাগে।
 তিনটি শটে গল্প বলা হয় এখানে। কখনো এক লাইনেও বলে দেওয়া হয়। নেপথ্যের পিক্টোরিয়ালে থাকে সহযোগী ছবি। এ মুহুর্তে মোটিভেশনাল ভিডিও-র থেকে মেম কিন্তু আলাদা। ও ধরনের ভিডিওতে জীবন সম্পর্কে ধারণা দেওয়াই প্রধান উদ্দেশ্য থাকে। মেম যে বানানোই হয়, স্মার্টফোনে স্ক্রল করা পাব্লিক চটজলদি জেনে নেবে উথলে ওঠা জীবন সত্য।   
"সে এখন অনলাইন, কিন্তু তোমার জন্য নয়।" সদ্য ৩৭৭ পাশ হয়েছে। তা নিয়ে একটা মেম বানানো হয়েছে। গুপি গাইনের সেই মুহুর্ত যেখানে রাজকন্যা কম পড়ায় দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে গুপি-বাঘার সাথে রাজার। বাঘারো রাজকন্যা চাই। এদিকে পাত্রী গুপির জন্য। এদিকে রাজা বলছেন, আমার তো একজনই পাত্রী। তাতে মেম এ বাঘা বলে ওঠে, "চাপ নেই। এখন তো সমকামিতা অপরাধ নয়। রাজকন্যা লাগবে না। তা হলে, আমি আর গুপি মিলেই.." 
আপনার মনে হতে পারে এসব অশ্লীল। নোংরা। কিন্তু মেমের রাজনীতিই তাই। তবে মাত্রাছাড়ানো চটুলতার দোষো আছে। সেগুলোকে আমি বাদ রাখছি। একটি মেম যেমন দেখাচ্ছে, বাসের দু ধারে দু"জন বসে। বাসটি চলেছে পাহাড় দিয়ে।একজনের মুখে হাসি, একজনের মুখ গোমরা। নীচে লেখা, জীবন যে যেভাবে দেখে। এমন বিস্ময় উসকে দেওয়াই মেমের উদ্দেশ্য।
বিস্ময় কি? আনন্দামানে বেড়াতে গেছিলাম ছেলেবেলায়। সমুদ্রের ধারে বসেছিলাম। অনেকটা সময়। চোখ লেগে আসছিল। অদূরে একটা ডিঙি-নৌকা ভাসছে মনে হল হঠাৎ। কালো, শ্যাওলামাখা।
কাছে গেলাম জলের। দেখলাম, প্রমাণ সাইজের কচ্ছপের পিঠ ওটা। কচ্ছপটি সানন্দে দুনিয়ার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলেছেন সমুদ্রে। কোনো বাধা নেই তার। তাড়া নেই কোনো। যেমন, চতুরংগের শেষে শচীশ "অসীম অসীম" চিৎকারে ছুটে চলে সমুদ্রধারে। রবি ঠাকুরের "দূরে কোথাও দূরে দূরে" বেজেছিল কানে।
আমি অসীমের ধারণা পেয়েছিলাম। কোহেন সুজান গাইছিলেনো হয়তো অদূরে, মেঘে ঢাকা তারায়।
এই স্মৃতি বলতে গিয়েই সাম্প্রতিক মেম থেকে চলে গেলাম আবহমান ক্লাসিকের ধারণায়।  
আমরা কেন ক্লাসিকের কাছে ফিরে যাই? 
বন্ধুত্বই যে আবহমানতার শেষ কথা তা জানতেই হয়তো। 
"বাজলো আলোর বেণু" ক"দিন পরেই বাজবে। কি হবে বাঙালির বুকে? কি হয়, পথের পাচালির আবহ বাজতে থাকে যখন? রবিশংকর যখন বাজাতে বাজাতে ভগবান হয়ে যান!
রবিঠাকুর বলবেন,  "ক্লাসিকিয়ানার মোহ"। ঘটক দেখাবেন, তিতাসের শেষ শটে নদীর পেটে ঘাস জন্মাচ্ছে। সভ্যতা মরে না। মূল উপন্যাসে যদিও ছিল, সভ্যতা মরে। নদী শুকিয়ে যায়। কমলকুমার বলবেন, লেখা মানে তাহাকে ডাকা।
ইতালো কালভিনো তার " Why read classics" এ এই নিয়ে বেশ কিছু জরুরি কথা বলেছেন।
সুমন কিছুদিন আগে বললেন, " সংগীত একটা নিখিল অভিজ্ঞতা।" 
তিন ভুবনের পারে, বসন্ত বিলাপ, দেয়া-নেওয়া ছবিগুলোতে এই বন্ধুত্ব রাখা আছে। হালের ম্যাডলি বাঙালি, ভূতের ভবিষ্যতেও রয়েছে এই প্লুরালিটি, বহুত্ব। আমায় প্রায়রোজ দেখতে হয় ছবিগুলো। এগুলো তো ক্লাসিক না। তবে?
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, তুলসী চক্রবর্তী, পাহাড়ি সান্যালরা আজ বাংলা ছবিতে ব্রাত্য। গাস্টিন প্লেসের ভূত। সহ অভিনেতা বলে কিছু নেই আর। যেমন নেই গ্রাম। আছে শুধু অন্ধকার, হিন্দুস্তান রোডের ফ্ল্যাটের লিভ-ইন দম্পতি, সুইগি, ফেসবুক আর বাকুড়ার ঘোড়া!
 মা চলে এলেন যেন-বা।
আমরা যারা নারীর সন্ধানে শহর আর শহর সন্ধানে নারীকে চেয়েছি, আসলে চেয়েছি মা-কে, তারা তো আসলে যোনিপথ চেয়েছে। যে রাস্তায় গুরু গাছ হয়ে যান আর গাছ Philosopher.
 সুমন কোনো অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ইতালো কালভিনোর "ইনভিজিবেল সিটিজের" কথা। এ উপন্যাসে শহর, নারী, প্রেম, কামনা, স্মৃতি সব এক হয়ে যায়। এ উপন্যাস পড়ার পর আমি আর ঠিক আগের মানুষটা নেই।
আমরা তো মা-কে চেয়েছি আসলে। ঘটককে যেমন মজা করে বন্ধুরা বলতেন, তোকে মা-এ খেয়েছে। নবারুণের মধ্যেও ছিল এই অসম্ভব ক্রেভিং ফর লাভ। সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যা বড় মায়াময়। রবি ঠাকুর লিখে ফেলেন, তোমায় দেখেছি শারদপ্রাতে। যেন শিকারের আগে হরিণের চোখ।প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে দেখা।  ডাইরিতে লেখেন, যত বার শেষ বয়সে ছবি আঁকেন, প্রথম প্রেমিকার চোখ একে ফেলেন। তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা। জাত কমিউনিস্ট মানিক ডাইরির শেষে মা-মা করতে থাকেন। বিজনের দেবীগরজনে কালী মঞ্চে উঠে আসে। কমিউনিস্টরা গাল পাড়েন। নবারুণ বলেন, মাদার কাল্ট আবার কি। দেশটাই তো মা। এরা গ্রামার বানাচ্চে বাঞ্চোৎ। এদের গ্রামারটা শেখ। 
   জানিনা মানুষ জীবনভর কি খোজে। কিচ্ছু জানিনা। শুধু জানি, এ শহরটা আমার মা। এর প্রতিটি শিরা-উপশিরায় আমি পাই নারী, প্রেম, কামনা, স্মৃতি। 
মা। দুনিয়ায় সবচেয়ে আশ্চর্য এ শব্দের সাউন্ড।
মা। আসছেন। 
গুরু-মা-বাবা। আলি আকবর খানের বাড়িতে সন্ধ্যার ক্লাস সবে শেষ হয়েছে। কিছু ছাত্র বেরিয়ে পড়েছেন। ক"জন গুরুর সাথে আরেকটু কথা বলে বেরতে চান। এদিকে গুরু ক্রমশ ছটফট করছেন। ছাত্ররা কারণ বুঝতে পারছেন না। সবে ৯টা বেজেছে। গুরু বলছেন, "যাও যাও"। 
এক ছাত্র আর না পেরে বলেই ফেললেন, আপনার কি কোনো কাজ আছে? এত ব্যস্ত হচ্ছেন। কিছুটা রাগ আর উদাসীনতা মিলিয়ে আলি আকবর বলে উঠলেন, আরেকটু পর বাবা নেমে আসবেন না! আমায় সুর সেবা করতে হবে তো! 
বলা বাহুল্য বাবা আলাউদ্দিন প্রয়াত হন আগেই।

ধারায় ধারায় পেয়েছি তোমায়-সবর্না চট্টোপাধ্যায়







 ---- চিনিয়েছে কিভাবে ফোটে ভোরের মুকুল

ওষুধের গন্ধ আমার কোনদিনই ভালো লাগেনা। তবু এ যেন এক আলাদা ঘোর। নতুন গান শুরু হবে। এখন আলাপ চলছে। বেজে উঠবে সেতারের ঝংকারে তবলার যুগলবন্দী।  বন্দিস চলছে কোথাও আর সে শুয়ে শুয়ে মজা নিচ্ছে পাশেই ছোট্ট একটা দোলনায়। জানলার ধারে ফুটেছে নতুন রজনীগন্ধা। আলোয় ছটফটে তার খুদে খুদে হাত পা। আচমকা সব মূর্ছনা থামিয়ে গলা ফাটিয়ে স্বরলিপি সাধল কোমল নি। নার্স এসে কোলে দিয়ে গেল। তুলে নিলাম সাদা একফালি শরতের মেঘ। জ্ঞান ফেরার পর আমার আর তার প্রথম স্পর্শ। বৃষ্টি নামল অঝোর। ভেতরে বাইরে এলোপাথাড়ি হাওয়া। জানলার পাল্লাগুলো ঝাপটাচ্ছে  ইচ্ছেমতন। পাড় ভাঙছে স্তরে স্তরে। একটা মেয়ে ক্রমশ মা হয়ে উঠছে। নিঃশব্দ রাতের স্তব্ধতাকে ভেঙে তারপর থেকে জাগ্রত প্রহরীর মতো রাত কেটেছে টানা পাঁচমাস। আর দিন বয়ে গেছে জলের স্রোতে। ক্রমশ একটু একটু করে ভরে উঠেছে একটা গাছ। ভাবতে অবাক লাগে একটি শিশু তার নির্বোধ সরলতা দিয়ে কিভাবে একটি মাতৃস্নেহের অঙ্কুরোদগম ঘটালো। সেই মাতৃত্ব যা ফল্গুধারা মত তার মধ্যে গেঁথে ছিল বহু আগে, তারই অজান্তে। এখন তাতে যেন ভরা জোয়ার।

মা এমন একটি মানুষ যিনি, একটি শিশুপ্রাণের প্রথম শিক্ষক। তার সারা শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত গন্ধ যা শিউলির চেয়েও পবিত্র। তার আঁচলের খুঁটে ভেজা মুখ মুছে ফেলা বা মুখের চিবানো পান পাতার গন্ধ, মায়ের সবটুকু ভরে থাকে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতায়। বিরাট এক ভরসার মাটি এই মা। শত বকাঝকার পরও তার গলা জড়ানো আদরটুকু খটখটে রোদের পর এক পশলা বৃষ্টি।
পাহাড়ে তখন ভোর নেমেছে। কিভাবে জানিনা মা ঠিক জানতে পারতেন। সূর্যের সাথে তার এই বন্ধুতা আরও পাকা হল আমি আসার পর থেকে। নিমেষের মধ্যে সবকাজ পরিপাটি সেরে তিনি হয়ে উঠতেন খেলার সাথী। আমি আজও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি কিভাবে সবদিকটুকু সামলে তিনি মা হয়ে ওঠেন প্রতিদিন। তার কোন বিশ্রাম নেই। আর এই শেখারও কোন শেষ নেই। চোখ খোলার সাথে সাথে মা ও সন্তানের এই শিক্ষার যে সংযোগ শুরু হয়,  চোখ বোঝার পরও তা শেষ হয় না যেন...

বইয়ের ভাষায় বলতে গেলে মা হল সন্তানের প্রথম ও প্রকৃত বিদ্যালয়। হামাগুড়ি সকাল গুলো মায়ের কোলেই বেড়ে উঠেছে ঠিক যেমন কুমোরের হাতে গড়ে ওঠে এঁটেল মাটির একদলা তাল। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপু ও সর্বজয়ার কথা বাংলা সাহিত্যে কে না জানে! ভরদুপুরে মায়ের কাছে মহারথী কর্ণের গল্প অপুর কচিমনে যেভাবে ছাপ ফেলেছিল আমার বাস্তবটাও কেটেছে খানিক সেরকম ঘোরে। বিবেকানন্দের জীবনে তাঁর মা ভুবনেশ্বরী দেবী ও ঈশ্বরচন্দ্রের মা ভগবতী দেবীর ভূমিকার কথাও শুনেছি বহুবার। ছোট থেকে মায়ের মুখে শোনা যৌক্তিক অযৌক্তিক নানান গল্প, মহাপুরুষদের জীবনী, দৈনন্দিন কাজগুলো করার মতো নানান শিক্ষনীয় বিষয় সহজপাঠের মতই লেখা হয়ে গেছে চিরটাকালের জন্য। যা পরবর্তীতে নিজেকে মা করে তুলতে সাহায্য করেছে প্রচুর।

শিক্ষা কার কাছ থেকে না পাওয়া যায়, শুধু শেখার ইচ্ছা থাকা চাই। বইয়ে পড়ার আগেই মায়ের মুখেই শুনেছিলাম সুনির্মল বসুর বিখ্যাত সেই ছড়া, “ আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাই রে/ কর্মী হওয়ার মন্ত্র আমি হাওয়ার কাছে পাই রে”। সত্যিই তো। কি বিচিত্র এই প্রকৃতি। সুনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মানুবর্তিতায় ভরপুর। বহমান নদী হোক বা পাহাড়ি ঝরণা, রঙীন প্রজাপতি হোক বা অস্ট্রেলিয়ান পেলিকান সবাই চলছে তাদের নিয়মের ধারায়। পাহাড়ে সোনালী ভোর। মেঘের বারান্দায় ঝকঝকে রোদ। আচমকা ঝড় এলেও তাকে ধারণ করার সহ্য ক্ষমতা রাখে আকাশ। কি না নেই তার বুকে? লক্ষলক্ষ তারা, গ্রহ উপগ্রহ, শূন্য ছাড়িয়ে মহাশূন্য। এতএত অস্তিত্বের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে এই প্রকান্ড শূন্য ছাত। দুহাত দিয়ে আগলে রেখেছে পাহাড় নদী উপত্যকায় মোড়া সবুজ সমতল।
পাহাড়ের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ল, ছোট্ট একটি প্রসঙ্গ। পাহাড়ে জলের কষ্টের কথা অজানা নয়। সেবার রিশপে গিয়ে দেখেছিলাম বৃষ্টির জলকে তারা কিভাবে চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করে একটি পাত্রে জমা করে রেখে নিজেদের প্রয়োজনে কাজে লাগায়। সে দৃশ্য দেখার পরই আমার চোখে ভাসতে থাকে আমাদের কলকাতার ছবি। হাওড়া ব্রীজ ছাড়িয়ে বাস এগোচ্ছে শহরের দিকে আর অসংখ্য খোলা কল থেকে ঝরণার মত জল গড়িয়েই চলেছে বিনা বাধায়। কি অদ্ভুত, তাই না? এই পাহাড়ি মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার লড়াইটুকু কি শিক্ষকের ভূমিকা নিতে পারেনা?

তখন আমরা ভাড়াবাড়িতে থাকি। রোজ বিকেলে একটা লোক এক প্যাকেট বিস্কুট এনে পাড়ার চারপাঁচটা কুকুরকে খাওয়াতো। ঝুলকালিমাখা লোকটাকে সবাই পাগল বললেও অবাক লাগত এই ভেবে সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষরা যেটা করতে হাজার বার ভাবি সেটাই সে কি অনায়াসে করে ফেলছে কোন চিন্তা না করেই। ঈশ্বর সেবা কি এভাবেই শুরু হয়? জানা নেই। তবে যে বিবেকানন্দ বলে গেছেন “ জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর”। পশু পাখি পোকামাকড় গাছপালা থেকে মানুষ, সকল জীবের প্রতিই নূন্যতম কোমল মনোভাবটুকুই কি ঈশ্বর সেবার প্রথম ধাপ নয়?

দয়া দান কোমলতা বিনয় দায়িত্ব আমাদের চরিত্রকে মজবুত করে, আত্মমর্যাদাকে উন্নত করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের কথা। শ্রী ম ( ঠাকুরের পরম ভক্ত মাষ্টার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) লিখেছেন
ঠাকুর পরমহংস দেবের সাথে বীরসিংহের সিংহশিশুর প্রথম সাক্ষাত। কলকাতার বাদুড়বাগানের বাড়িতে সাগরদর্শনে চলেছেন রামকৃষ্ণ। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দর্শন পেলেন সিংহশিশুর। সৌজন্য বিনিময়ের পর ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হয়ে বেঞ্চে বসেছেন। আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরে জ্বালা ধরতে শুরু করেছে। কারণ একটি সতেরো-আঠেরো বছরের ছেলে। সেও ওই একই বেঞ্চিতে বসেছিল।  বিদ্যাসাগরের কাছে পড়াশোনার সাহায্য প্রার্থনা করতে এসেছিল ছেলেটি | ঠাকুর তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে বুঝেছেন ছেলেটির অন্তরের ভাব। তিনি বুঝেছিলেন ছেলেটি সংসার, লোভ ছাড়া কিছু বোঝে না। তাঁর মতে ছেলেটি ছিল অবিদ্যার ছেলে। যে ব্যক্তি ব্রহ্মবিদ্যার জন্য ব্যাকুল নয়‚ শুধু চায় অর্থকরী বিদ্যা‚ ঠাকুর তাকেই বলছেন অবিদ্যার সংসারে অবিদ্যার ছেলে। তাই তাঁর শরীরে জ্বালা। ঠাকুর ছেলেটির কাছ থেকে দূরে সরে গেলেন | সেই প্রথম ধাক্কা খেল বিদ্যাসাগরের প্রত্যয়। তিনি নিজেও তো ব্রহ্মবিদ্যার কথা ভাবেন না কখনও ! ঠাকুর একেবারেই লেখাপড়া জানেন না | নিজের নামটিও সই করতে পারেন না | তবু ঠাকুর বলছেন আর শুনছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মন্ত্রমুগ্ধের মতো ! বিদ্যাসাগরের মনে হচ্ছে যেন বেদান্ত উচ্চারিত হচ্ছে ঠাকুরের কণ্ঠে ! অথচ কী সহজ সরল শ্রীরামকৃষ্ণের মুখের ভাষা ! শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হল চরিত্রগঠন। যে শিক্ষা মানুষকে স্বার্থপর অহংকারী রূঢ় করে তোলে সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা কখনই হতে পারে না।  শ্রীশ্রীস্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের ‘অখন্ডসংহিতা’ র মূলমন্ত্রও এই চরিত্রগঠন। নেতাজীর মতেও চরিত্রগঠনের জন্য “ রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সাহিত্য “ হল সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সাহিত্য। এইবইগুলি  আমাদের সত্ত্বগুণকে জাগ্রত করতে সাহায্য করে। শিক্ষালাভের পথে এগুলিও এক মহান শিক্ষকের গুরুদায়িত্ব বহন করে।

স্কুল কলেজে বহু শিক্ষক শিক্ষিকার সান্নিধ্য পেয়েছি যারা স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। তাদের জ্ঞান, ভালোবাসা, চারিত্রিক দৃঢ়তা সেসময়কার কাঁচামনকে পোক্ত করত। প্রেরণা দিত।
এজীবন বড়ই বিচিত্র। অভিজ্ঞতার রামধনুতে ভরা ক্যানভাসে এমন শিক্ষকও এসেছেন যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা জ্ঞানের মাধুর্যে একদিকে যেমন পূর্ণ হয়েছি, আবার অবাক হয়েছি তাদের চারিত্রিক ত্রুটির ভয়াবহ দিকটি দেখেও। নারী শরীর দেখলেই যেভাবে তাদের হাত ও চোখ লালসায় নিসপিস করত তাতে বিদ্ধ হতাম বারবার। বিভিন্ন কারণবশত ছাত্রীদের মৌনতার সুযোগে তারা নিজেদের লালসাপূর্তি ঘটাতেন অনায়াসে। ভারি অবাক হতাম নিজের কাছেই। যে শিক্ষক প্রতিবাদের ভাষা শেখান, যিনি পথপ্রদর্শক হয়ে স্বপ্ন দেখান তার এই ঘৃণ্য কদর্য আচরণে হতবাক হয়ে যেতাম।  বুঝতে পারতাম না তাকে শ্রদ্ধা করব নাকি সকলের সামনে অপমান। শিক্ষাক্ষেত্রে এই দোটানায় আমার মতো হাজারো নারী হয়ত পড়েছেন বহুবার। ভবিষ্যৎও পড়বেন। তবে এখন বুঝি, যেটা সেসময় পারিনি, এমন অবস্থার সৃষ্টি হলে অবশ্যই দ্বিতীয় পদক্ষেপটিই নেওয়া উচিত। কারণ শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে আর যাই হোক প্রকৃত শিক্ষা বিচার হয় না।

শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী, আত্মবিশ্বাসী করে। আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করে।  বাবা কোনদিনই পড়াশোনায় মুখ্য ভূমিকা পালন না করলেও তার দায়িত্ববোধ উপকারী মনোভাব আমায় সে পথ অনুসরণ করতে শিখিয়েছে। বাবার বুকের মধ্যে একটা সবুজ মাঠ ছিল। অফিস থেকে ফেরার পরও ক্লান্ত অবসন্ন মনটা নিয়েও নেমে পড়তেন মাঠে। সে সময়টুকু শুধু আমাদের ডাংগুলি বেলা।
এ শিক্ষার জগত বড়ই বৃহৎ। শিক্ষক সংখ্যাও নেহাত কম নয়। যেটুকু যার ভালো সেটুকুই শেখার মতো। মনটুকু প্রশস্ত করে তুললে আর নতুন বিষয় শেখার আগ্রহ থাকলে শিক্ষক খুঁজতেও সময় লাগে না। কোন মানুষ যেমন শিক্ষক হতে পারেন তেমন কোন ঘটনাও এ ভূমিকা নিতে পারে অনায়াসে। অভিজ্ঞতায় ভরা এ জীবনে প্রেম ভালোবাসা বিরহ বিচ্ছেদ অতি স্বাভাবিক সত্য। সম্পর্কের ঢিবিতে মাটি চাপাতে চাপাতে যখন শত চেষ্টাতে খসে যায় পলেস্তারা, দুজন মানুষ সমান্তরালে চলতে চলতে হঠাৎ যদি থেমে যায় একজন, তখন? সে ভার কি চরম শিক্ষা নয়? সে ভাঙা সম্পর্ক কি এক পোড় খাওয়া শিক্ষক নয়?  ভাবতে আবাক লাগে, বিচ্ছেদ জীবনের কি ভীষণ এক সত্যি। শত চেষ্টাতেও আটকানো যায় না ছেড়ে যাওয়া প্রিয়মানুষটাকে। সবকিছু উজার করে দিয়েও দুটো শূন্য হাত খামচে ধরছে নদীর জল। জাপটে ধরছে বাতাস। অথচ একদিন এই নদী এই বাতাস তাদের হাত ধরে সন্ধে থেকে রাত, রাত থেকে ভোর শুধু বয়ে গেছে নিরবে নিভৃতে।
আচমকা এ বিচ্ছেদ সামলাতে সময় লাগে ঠিকই, তবু সামলাতে হয়। শেষ সময় থেকে আবার নিজেকে ফিরিয়ে আনতে হয়।
জীবনের স্বার্থে আবার হাসতে শিখতে হয়।যখন মানুষ মেনে নিতে শিখে যায় চরম সত্যকে তখনই অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায় জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। ঠোক্কর খেতে খেতে পরশপাথরের সন্ধান মেলে পলিজমা নদীগর্ভে। সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে দাঁড়ায় এই জীবন। গাছে ফোটা একটা ফুল দেখে যে হেসে ওঠে অবলীলায়, কচুপাতায় দুবিন্দু জলে যার চোখে হীরের ঝলক ফুটে ওঠে, রোদ উঠলে যার চৌকাঠ নিসপিস করে সারা উঠোন দৌড়ে বেড়ানোর জন্য, ছাতে মেলা তারে যার চোখ শুকিয়ে আসে ঘুড়ির প্যাঁচ দেখতে দেখতে সে পারে নিঃসঙ্গতার ওপারের ঝলমলে ঝরণাটাকে ছুঁতে। সূর্য ডোবার সময় সাগরের ফসফরাস ঢেউগুলোয় জেলিফিস কুড়োতে কুড়োতে সে আওড়ে চলে একলা চলার গান।
সে গান তার অন্তরে গেঁথে নিয়ে পথ চলা শুরু হয় নতুন করে। মনে পড়ে, মায়ের মুখে শোনা  “ তুমি অধম তাবলে আমি উত্তম হইব না কেন” বঙ্কিমচন্দ্রের সেই বিখ্যাত লেখা। বড় সত্যি কথা। এ শিক্ষা কোন একদিনের শেখা না। জীবনের ভুলগুলো থেকে যে শেখা তার চেয়ে গভীর আনন্দ আর কিছুতে নেই হয়ত। কারণ এক্ষেত্রে শিক্ষক আমারই জীবন আর শিক্ষার্থীও আমি নিজে।

আগেই বলেছি, মায়ের চেয়ে বড় শিক্ষক আর কেউ নেই। মায়ের দেওয়া সবকিছুই কখন যেন গাঁথা হয়ে যায় অজান্তেই।
 জীবনে মাতৃত্ব আসার পর থেকে টের পাই একটি শিশু কিভাবে টেনে হিঁচড়ে আমার ভেতর থেকে নিংড়ে আনছে আমারই মাকে। আমার মুখ দিয়ে যেন অনর্গল বলে চলেন মা। কচি কচি হাতপা গুলো নেড়ে চেড়ে সে শিক্ষক আমায় চোখরাঙায় ভয় দেখায় ঠোঁট ফোলায়। আর আমি দিনে দিনে ফুটে উঠি মায়ের মতো।

মানুষে মানুষে যার বড় হিংসা। মারামারি কাটাকাটি স্বার্থপরতা। লোভ লালসার এই নীলগ্রহে মহামারির মতো দেখা দিচ্ছে দাঙ্গা। যে ইতিহাস আমাদের এ ভয়াবহতার শিক্ষক হতে পারে তাকে আজ ভুলতে বসেছে মানুষ। একসময় মাদিদিমার মুখে মুখে শিখেছিলাম,
‘’ কুকুরের কাজ কুকুর করেছে
কামড় দিয়েছে পায়,
তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে
 মানুষের শোভা পায়?”

সে শিক্ষা আজ বিফল। কদর্য মানুষ আজ গর্ভবতী কুকুর ছাগলকেও ধর্ষণ করে। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি শতাব্দী কি সত্যিই প্রগতির পথে? উন্নতির পথে? কজন শিশুকে আজ শেখানো হয় শিক্ষক দিবস কেন পালিত হয়? যে দেশে রোজদিন অনাহার হিংসা দলাদলি, ঘৃণ্য রাজনীতির পীড়ণ সে দেশ সে সমাজ আর যাই হোক প্রকৃত শিক্ষা পেতে পারে না, যে শিক্ষার কথা বলে গেছেন রামকৃষ্ণ, যে শিক্ষার কথা বলে গেছেন বিবেকানন্দ, সেই শিক্ষারই আজ বড় প্রয়োজন।

মায়ের কোলে যে ভোর ফুটে ওঠে , আড়মোড়া ভাঙে হাই তুলতে তুলতে , তাকে জড়িয়ে নেয় বাতাস ,জড়িয়ে নেয় আলো। প্রদীপের শিখায় ভরে ওঠে তুলসীতলা। তারপর উঠোন ছাড়িয়ে রাঙাপথ শহর বন্দর, আকাশ,বাতাস ভরে দীপশিখায়। আঁধার রাতের বিষণ্নতায় পিন ফুটিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে জোনাকির দল। থমথমে বাতিঘর আলোয় আলো। মন ভরে উঠছে ক্রমশ মানুষের। প্রশস্ত হচ্ছে পথ। মিশে যাবে নদী নোনাজল সবধূলো জমা আঁশটে বাতাস। শত যন্ত্রণার মাঝেও পরকে আপন করে নেওয়ার দিব্যচক্ষু খুলে দুহাত বাড়িয়ে দেবে বিশ্বাসে। দুঃখকে সত্য ভেবেই সে শিক্ষা এগিয়ে দেবে পায়েসের বাটি। বরপ্রাপ্ত ঈশ্বরপুত্রের দল চুমুক দেবে শিশুবালকের মতো। সকল ত্রুটি থেকেই জীবন যেন হয়ে উঠুক সবচেয়ে বড় শিক্ষক এ উপলব্ধি আসুক মানুষের মনে, এমন আশা রাখি...











 



গদ্য- রাইজন্ম ছাইজন্ম: মৌমিতা মিত্র





থাকে শুধু..

অস্তের পর রেনবো জেম কেটে গিয়ে যে ভ্যানিলার বল উঠত আকাশে, তার গায়ে লেপটে থাকত। 
অন্ধকার। 
অন্ধ করে যে- সে আমায় শিখিয়েছে অনেককিছু। 
শিখিয়েছে দিন মানে being sane ;
রাত মানে বনলতা সেন। দাদুর দস্তানায় লুকোন হিসেব আর অনুভূতির লম্বা নজরানা।  

অন্ধকার শিখিয়েছে মূত্রনালী ফেটে পড়ার উপক্রম আর ভূতের পারস্পরিক সম্পর্ক। ড্রাকুলা আর কার্মিল্লা বা মিল্লার্কা বা মির্কাল্লার প্রেম ও বিয়ের সম্ভাবনা; এমনকী 'কচি তারা কথা ফোটে না 'গোত্রের রক্তচোষা পোলাপান অন্ধকারের আবিষ্কার।

ডিসি।
সন্ধ্যে হলেই লোডশেডিং, দেওয়ালগিরির সন্দেহজনক গন্ধ, প্রোজেক্টর দেয়াল, রহস্যময় আংগুল, ছায়া হরিণ- ওই অব্দিই দৌড় ছিল। দিদিভাই আরও অনেক কিছু পারত। কুকুর,  উট, পায়রা। দিদিভাইয়ের হাতের কাজ ভাল বরাবর।  সেইপ্রথম জানা গেল,  ছায়ারও এমব্রয়ডারি হয়। রহস্যেরও সরু সরু  চাকতি চাকতি শালপাতায় মোড়া কুলপি হয়, সিন্ডারেলা কিরণমালা সিন্দবাদ একই অন্ধকারে জিন্দেগী কা সফরে বেরিয়ে পড়ে মিলিয়ে যায়, বাকিটা..  কোই সমঝা নেহি, কোই জানা নেহি। লোডশেডিং এর ক্যাটারার বদলে যায়।  গ্রীষ্মমেনু আলু- পটলের তরকারি, দৈবাত কুমড়োর ছক্কা।  শীতমেনু  আলু - ফুলকপির তরকারি বা ডালনা, তাতে শ্যাওলার কান্নাফোঁটার মতো কড়াইশুটি;  টুপ কিংবা টাপ । 
খেয়েদেয়ে ছাদে গিয়ে গলিপথের দিকে চেয়ে থাকা। দিনগত  'পেচ্ছাপের গলি', বাতাসের অভিশাপে  মুতের গন্ধে টিকতে না পারা গলি,  রাস্তার কল থেকে অজগর - লাইনের ফণার সাথে লেজের একমগ জল নিয়ে ঝগড়া করার গলি, বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলনপথ পেরনোমাত্রই  রাস্তায় সদ্যজাত নরম কাঁচা  ভৌ কলকা অলংকৃত  গলি। বাড়ি থেকে বেরোলেই ডানদিকের আমৃত্যু গ্যারেজে ছুঁচো ইঁদুর আর বিড়ালের ফুলশয্যা লেবাররুম ও ক্রেশ আর গ্যারেজ ছাড়িয়ে রাস্তায় পা রাখলেই  ডানদিকে একটা ডাস্টবিনের গাড়ি, তাতে চব্বিশ ঘন্টা এক বা দুই বা তিন বা চারটে কুকুর লাফিয়ে পড়ে খাবারের  খোঁজে। মলয় বাতাসে মুতের সাথে সেই ডাস্টবিনের গন্ধ, কুকুর ও গ্যারেজের প্রাণীদের বর্জ্য ও উপস্থিতির গন্ধ সম্মিলিত গলিতেও - একটা মায়াস্নিগ্ধবিরতি ঢেলে দিত অন্ধকার। 
অন্ধকারই জানিয়েছিল, এ গলিরও একটা সৌন্দর্য আছে; এই রাস্তাটা শুধুমাত্র কল্যাণচক্র অভিযাত্রী ক্লাবে ধাক্কা খেয়ে পিছন দিকে সো - ও -ও - জা সাঁ করে চলে গিয়ে চক্রবেড়িয়ায় পড়ে এদিকে পূর্ণ বা ওদিকে জগুবাজারে মিশে না গিয়ে নির্ঘাত স্বর্গের দিকে বা জ্যোতস্নার দিকে যাত্রা করে, যেমন শিবের কথা আকাশ থেকে নেমে আসে বজ্র হয়ে, তেমন এই রাস্তা পেচ্ছাপের গলির কথা নিয়ে যায় অমরা ঐশ্বর্যে। 
এই গলির লাল রকেও বৃন্দাবন নামিয়ে দেয় অন্ধকার। কলেজ, কোচিং কামাই করা দৈবাত দুই রোমাঞ্চিত মাংস বাংময় যখন লাল রকে ঈষৎ নীল,  সেই নীলের প্রতি এপাশে ওপাশে যখন রক্তচক্ষুর কানাঘুষো অভিভাবকত্ব আর 'প্রেম করা মহাপাপ ও নষ্টামি'র পবিত্র মন্ত্র উচ্চারিত -  অন্ধকার আমাকে শেখায়, অন্ধকারের বুকে মহামোহময়ী অদম্য নির্লজ্জ বিদ্ধংসী দুষ্টু বিরাজে। 
একঘুম হওয়া একরাতে জানলার ওপারে বিন বিন করে কাঁদা এক রহস্যময়ীর অবয়ব। পাড়া পড়শীর জেগে ওঠা- 'ওখানে কে?? ' খিঁচিয়ে উঠে ভয়ার্ত নারীকে আরও ভয় পাইয়ে ভাগিয়ে দিয়েছিল অন্ধকার। এক বা একাধিক রিকশাওয়ালা হয়তো তাড়া করেছিল,  তার নিজেরও  হয়তো সম্মতি ছিল, তারপর ভয় পেয়ে পালিয়ে এসে এখানে লুকিয়েছে। অনেক ফিসফাস ছিল  সে রাত - বাতাসে। অন্ধকার বলেছিল, সতীসাধ্বীর বাইরেও একটা প্রাগৈতিহাসিক থাকে বা চির আস্তিত্বিক।
সেই আস্তিত্বিক অন্ধকার আমাকে জানায়, ওই ফুট দিয়ে  আনমনা ঢুলুঢুলু চোখ চাপদাড়ি ঢোলা জিন্সের হেঁটে যাবার সংগে রাতের পাশবালিশের সম্পর্ক। মাসিকের ন্যাকড়ার বদলে যখন থেকে ন্যাপকিনের ব্যবহার শুরু হল, তখন অন্ধকার জানাল,সে ঘনালে তবে ব্যবহৃত কর্ণন্যাপকিন আদা লংকা রসুন আনার ছোট প্লাস্টিকে পুরে তার উপর কুটনোর খোলা ফেলে সমাধি সম্পূর্ণ করে গা ঢাকা দিয়ে  অতর্কিতে গোপনে ডাস্টবিনে দাদা বাবা কাকাদের চোখ বাচিয়ে ফেলতে  হয়,  মাসিক একটা ছি ছি ছ্যা ছ্যা ব্যাপার তো। সে আরও জানায়, মাসিকের ন্যাপকিনটাও অন্ধকারে  বা খবরের কাগজে মুড়িয়ে আনতে হয়।  পাপীতাপী প্লাস্টিকটা ডাস্টবিনে ছুঁড়তে না ছুঁড়তেই কুকুর এসে শুঁকতে শুরু করে। গা গুলিয়ে ওঠে ঘেন্নায়। ভয় হয়। যদি বার করে ফেলে - লজ্জার একশেষ। তবে ন্যাপকিনে পাপীয়সীর নাম লেখা থাকে না ভেবে ভরসা হয়। অবশেষে  আনন্দ  হয়। যাক,  কেউ তো গুরুত্ব দিচ্ছে পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নেপথ্য  অমোঘকে।

অন্ধকার আমাকে মুখোমুখি বসায়। হাজার বছর ধরে পথ হাঁটায়। পথে কাঁটা বিছোয়। নীল শাড়ি পরে যমুনায় জল আনতে পাঠায়।পাগল হয়ে বর্ষারাতে বাড়ির বাইরে বার করে শ্যামসায়রে নাইতে শেখায়। যমুনার  বুকে হ্যাঁচড় প্যাঁচড় করতে করতে    ভিজে লতপতে ভারবাহী প্রেম  আর কোল্ড এলার্জি সামলে ওপারে কুমীরের মতো বুক বেয়ে উঠে যখন  হাপর - হাঁপে জর্জরিত,  দেখি,  বাঁশীটা ফেলে গেছে অশ্যামশালা। ঝেড়ে ঝেড়ে ঘাট থেকে ঘাত আর প্রতিঘাত বার করছেন বিভূতিভূষণ। দোবরু পান্নার পূর্বপুরুষদের আরণ্যক টিলাসমাধির  সামনের এক  ঢিবিতে বসিয়ে তিনি যখন আমার হাতে বুনো তেউড়ির ফুল তুলে  দিলেন,  আমি সন্দিগ্ধ চোখে তাকালাম তার  দিকে আর কদম ফুলের সাথে এই  ফুলের কতটা সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য আছে,  তা মাপতে থাকলাম। ঠিক এইরকম একটা সময়ে তারকোভস্কি' ঘর খুলে যায়, জানলার কাচ ভেংগে অচিনপাখি পালায়, সাদা লেসের পর্দা হাওয়ায় দুলতে থাকে,  আমি এগোতে থাকি, অন্ধকার আমার হাত ধরে।  আমি এগোতে থাকি। অন্ধকার আমার কানে মুখ রেখে বলে, 
'রাইজন্ম ছাইজন্ম, যদি না পড়ো ধরা..'

আমার প্রিয় শিক্ষক-- মণিমেখলা মাইতি







ঠিক মাঝখানে লাল গুটিটা। তার চারিদিকে জ্যামিতিক আকারে সাদা-কালো, সাদা-কালো। একটু হাত দিয়ে ধরে ঠিকঠাক করে নিশানা ঠিক রেখে ঠকাস করে শব্দ। নিস্তরঙ্গ ঝিলে যেন কেউ ঢিল ছুঁড়ল।দীঘির মধ্যে চুপ করে থাকা জল চূর্ণবিচূর্ণ হতে হতে ঢেউ হয়ে  তির তির করে এগিয়ে যাচ্ছে অতলান্তিকের দিকে। তেমনি সব সাদা-কালো গুটিগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ল। একটা সাদা পকেটেওপড়লনা। স্ট্রাইকার চলে গেল ডানদিকে যে তার কাছে। তারপর আরো ডানদিকে। এবার আর বিরাম নেই। একের পর এক সাদা গুটির ইহলীলা সাঙ্গ হচ্ছে। মেয়ে নির্বাক। কী নির্ভুল নিশানা।  চৌকোনোকাঠের ময়দানটা ফাঁকা হয়েই এল। দুটো লাইনের মাঝে গোল চাকতিটা রেখে হঠাৎই মুখ তুলে উল্টোদিকে বসা কন্যাকে প্রশ্ন--"আচ্ছা, lieutenant বানান টা কী?" মেয়ে এবার আমতা আমতা করছে।শেষ সাদাগুটিটা নির্দ্বিধায় পৌঁছে গেল ডানদিকের পকেটে। রণাঙ্গন ফাঁকা। উত্তর চলে এল--' মিথ্যে তুমি দশ পিঁপড়ে।' আবার গুটি সাজানো চলছে। পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ক্ষেত্র। এরকম করেআরো দুতিনটে বানান। মেয়ের মাথায় গীতার বাণীর মত সব গাঁথা হয়ে গেল। 



   ছোট্ট মেয়ে হাত ধরে চলেছে বাবার সঙ্গে। মাথায় তার এক ঝাঁকা চুল। বাবার হাতে নাইলনের তৈরি বাজারের ব্যাগ। কত বকবকানি। পায়ে পায়ে মেয়ে ছুটছে। রাজবাড়ির ভাঙা গেটের কাছে গড়বরাবর ওই বড় ইস্কুলটা পেরিয়ে খাল ডিঙ্গোলেই মফস্বলের বাজার। উঁচু ব্রিটিশ আমলের ব্রিজ থেকে ডানদিকে লাল স্কুল বাড়িটা থেকে দৃষ্টি আরেকটু বাড়ালে হলুদ রং করা বাবার কলেজ। বাবা পড়ায়সেখানে ইংরেজি সাহিত্য। ছাত্রদের সঙ্গে স্যারের ভারী আহ্লাদ। তারা কবি সম্মেলন করে, পত্রিকা বের করে, মেয়েরা গেয়ে ওঠে--" মোরা জলে স্হলে কত ছলে মায়াজাল গাঁথি"। ছোট ছোট চালার মতসারিসারি সব দোকান। গ্রামের বাগান থেকে চাষীদের হাতে বয়ে আনা সব তাজা তাজা সবজি। ছোট ছোট বেগুন, সবুজ সবুজ পটল, শিরা তোলা কচি ঝিঙ্গে, নরম ছনছনে পুঁইশাক, ছোট ছোটপাতাওয়ালা লালচে নটে, আলু, বেগুন, পিঁয়াজ আরো কত কী। বাবা নিজের হাতে তুলে তুলে মেয়েকে শিখিয়ে দিচ্ছে কেমন হাত দিয়ে ছুঁয়ে, বেছে সবজি কিনতে হয়। বেগুনে যেন পোকা না থাকে,ঝিঙে যেন শক্ত না হয়, ঢ্যাঁড়শ যেন বাচ্চা শিশুর মত নরম হয়, উচ্ছে যেন হয় একটু সবুজ সরু। আলু, পিঁয়াজ সব নিজের হাতে তুলে নিতে হয়, অন্যের উপর ভরসা করতে নেই। 

 সবজিওয়ালাদের বামদিকে শানবাঁধানো মেঝেতে লম্বালম্বি শুয়ে আছে সব রুই কাতলা মৃগেল। ভারী শরীরের লতিমাসি বলির কাঠের মত ইয়াবড় বঁটি নিয়ে বালতি থেকে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে হাপরটানা মাছগুলোর ওপর। সামনে একটা চ্যাপ্টা গামলায় কলাপাতার ওপর ধনুকের মত বাঁকছে কয়েকটা কইমাছ আর পাঁকাল মাছ। মেঝের ওপর উপুড় হয়ে আছে কিছু চিংড়ি। হাত দিয়ে না টিপে,কানকোটা না তুলে একটু দেখে মাছ কেনা নয়। পৃথিবীতে শেখার কোন শেষ নেই। সেই যে অভ্যেস হল, সে অভ্যাস এখনো যায়নি। মাছ দোকান আর সবজি দোকানের মাঝখানটায় একটুকরো চটপেতে জড়োসড়ো করে বসে থাকে এক বৃদ্ধ। সামনে তার ছোট ছোট পুঁটলিতে কুমড়ো বিচি, ঢ্যাঁড়শ বিচি, চিচিঙ্গা বিচি। গোড়ায় কাদা মেখে শুয়ে থাকে কিছু বেগুন চারা। ওরাও সঙ্গে আসে। বাড়ি ফিরেজলে ভেজানো বীজ আর বেগুন চারা সব প্রোথিত হয়  বাড়ির সামনের এক চিলতে জমিতে। মেয়ে শিখে নেয় সব কিছু। মাটি কোপানোও একটা শিল্প যে। গোড়ার দূর থেকে খুরপি যাবে, শিকড়সুরক্ষিত অথচ মাটি আলগা। হাঁ করে মেয়ে খালি ভাবে।

  স্কুলে অনুষ্ঠান। মেয়ে দেবে ছোটখাটো বক্তিমে। বাবা মাটিতে বঁটি নিয়ে বসে। একে একে সরু সরু করে কাটা উচ্ছে, একটু মোটা মোটা, সমান করে কাটা কাঁচকলা, আলু, বেগুন সব জমা হচ্ছে পাশেরবাটিতে। সঙ্গে মেয়েকে ক্রমাগত নির্দেশ। কী বলতে হবে, কীভাবে বলতে হবে, কোন লাইন উদ্ধৃত করলে ভালো হয়। আনাজ কাটার পালা সাঙ্গ হলে  রান্না। খুন্তি ধরাটাও যে একটা আর্ট সেটাও বক্তিমেশেখার মধ্যে টুক করে শিখে ফেলা চাই। ফ্যান গালাবার পর হাঁড়িটা ভিজে কাপড়ে যে মুছে রাখতে হয় সে শিক্ষাও বাদ যায়না। আবার ব্যাডমিন্টন খেলার সময় রাকেটটা যাতে খুন্তির মত ধরা না হয়সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি। 

   প্রতিবছরের মত সেবছরও ময়নাগড়ে প্রবল বন্যা। নদী দুকূল ছাপিয়ে মাঠ, পুকুর সব ডুবিয়ে বাড়ি ঘরের প্রায় দোতলা ছুঁয়ে ফেলেছে। বাবা চলেছে একটা স্কুলে ইন্টারভিউ নিতে। সঙ্গী মেয়ে। যেদিকেচোখ যায় চারিদিকে শুধু জল আর জল। নৌকো জল সরিয়ে ছলাৎ ছলাৎ চলছে।  যে স্কুল বাড়িটাই শুধু জেগে। কলার মান্দাসে ভেসে গ্রামের বউরা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জেগে থাকা নলকূপ থেকে জলনিয়ে যাচ্ছে। হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট তুলে নৌকোয় ভেসে একে একে জড়ো হয় সব দরখাস্তকারী। তারপর ক্লাস টিচিং, ইন্টারভিউ।  ছোট মেয়ের হয়ে যায় জটিল  জীবনের হাজারো শিক্ষা। সবার সঙ্গে ডাল,ভাত মেখে খেতে খেতে ভাবে বড়ো হওয়ার ঝামেলা আছে বটে।



  টেন্সের খাতায় জ্বল জ্বল করে বাবার লেখা। গো ভার্ব দিয়ে করা কনজুগেশন মিক্সারের মত ছড়িয়ে যায় মস্তিষ্কর শিরায় শিরায়। কোনদিন ভুল হয়না তার। বাবার সংগ্রহের তাক থেকে টেনে নেয় সেচার্লি চ্যাপলিনের 'এই যে আমি', ' ওথেলো'মেয়ে পড়ে চলে পড়ার বই ফেলে দিনরাত। লোকে বলে বসে --'এই বয়সে এই বই! গোপনে প্রেম করতে সুবিধে হবে '। বাবা শুধু মুচকি হাসে। রবিবারের সকালেকী যে ছাই বোঝে তবুও খুলে  বসে কালিদাস রচনাসমগ্র। আত্মীয় খপ করে তুলে নিয়ে বলে--'  বয়সে  বই পড়ার নয়'। কই বাবাতো মেয়েকে কোনদিন বলেনি সাহিত্য আবার নাবালকের কিংবাসাবালকের। মেয়ে তাই অবাক হয়। কখনো বা সাহিত্যের তত্ত্বমূলক বই পড়তে পড়তে মেয়েকে ডেকে দেখিয়ে দেয় সব লাইন--"We play with words and words play with us"। সে সব লাইন  উঠেআসে মেয়ের খাতায় অগোচরে। অংক, পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন আর মেয়ের মন মজাতে পারেনা। জীবন চলে নিজের ছন্দে। কখন বাবা যে শিক্ষক আর শিক্ষক কখন বাবার আসনে বসে মেয়ে আজোবোঝেনি।



  খোলা ছাদে মাদুর পেতে হ্যারিকেনের আলোয় পড়িয়ে চলেছে দিদিমণি ধ্রুবতারা, কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমণ্ডল। মুখ তুলে আকাশে চেয়ে ছোট্ট মেয়েটি দেখে সারা আকাশ জুড়ে বইয়ের পাতা খোলা। ঘনকালো অন্ধকারে দিদিমণি চিনিয়ে দেয় সাতটি তারা, শিকারী কুকুর, সন্ধ্যাতারা। সেই মুহূর্তে গগনতল নেমে আসে বইএর পাতায় পাতায়। বহুবছর পর মেয়েটি তার আত্মজকে নিয়ে সেই খোলাআকাশের নীচে তারা চেনাতে গিয়ে দেখে সন্ধ্যাতারার কাছে জ্বল জ্বল করছে এক তারা তাতে মীরা পিসিমণির সেই পরিচিত মুচকি হাসি। কৃতজ্ঞতায় চোখে জল চলে আসে মেয়েটির। মীরা পিসিমণিকেপ্রণাম জানিয়ে আত্মজকে জড়িয়ে ধরে। চিনিয়ে দেয় একে একে কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমণ্ডল--সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

  সে বহু বছর আগের এক কর্মব্যস্ত বিকেল। হাওড়া থেকেই লোকাল ট্রেনে থিকথিকে ভীড়। কলেজ ফেরত ক্লান্ত পড়ুয়া, অফিস ফেরত শ্রান্ত  অফিসযাত্রী, সারাদিন মাছ, সবজি ফেরি করে সবপসারিনী, হকার সবাই আছে। উল্টোদিকে মলিন বস্ত্রে এক বুড়ি বসে। চোখ বুজে মাথাটা এলিয়ে দিয়েছে পিছন দিকে। কোলে একটা পুঁটুলি। আমার পাশে এক সুবেশা আধুনিকা। ডানহাতে ঘড়ি, উঁচুকরে বাঁধা খোঁপা, কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ। সুরভির গন্ধে ভুরভুর করছে চারপাশ। তাঁর পাশে আমি কোনরকমে বসে। পরনে সাধারণ চুড়িদার, এক শুভানুধ্যায়ী দেওয়া ব্যাগে ওই যাতায়াতের মান্হলি, কয়েকটা টাকা, আর বই খাতা। পেটে ছুঁচোর ডন। মন জুড়ে তখন শেক্সপিয়র,  গলসওয়ার্দি, হার্ডি। যেকোন বিলাসিতাই এক স্বপ্ন। হঠাৎই আমার সামনে বসা বুড়ি ঢলে পড়ল সামনে। অজ্ঞানরীতিমতো। আমার ব্যাগেও জল। কিন্তু   সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মত মানসিকতা হয়নি। হঠাৎই দেখি সেই সুবেশা তরুণী নিজের ব্যাগ খুলে জল বোতল বের করে জল ছিটিয়ে দিল পরমমমতায়। শাড়ি দিয়ে মুখ মুছিয়ে বৃদ্ধাকে আরাম করে বসিয়ে দিলেন। তার পর আমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে নিজের ব্যাগ থেকে কড়কড়ে চারটি দশটাকার নোট বের করে পরম মমতায় বেঁধেদিলেনসেই বৃদ্ধার মলিন  অঞ্চলপ্রান্তে। বললেন--" কিছু খেয়ে নেবেন"। আমার ভিতর থেকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল এই কথাগুলো--"you are so  great!" সুবেশা তরুণী বলে উঠলেন --'' না নাজানোনা এদের কত কষ্ট!! এরা না খেয়ে কেমন সারাদিন কাটে"। আমি তাঁকে মুহূর্তে দেবীর আসনে বসিয়ে ছিলাম। জীবন যে কোথায় পাঠশালা খুঁজে পায় এই বিশ্বজোড়া বিদ্যাঙ্গনে সে এখনো আমারকাছে এক রহস্য। 



  যে ছেলেটি ঝড়জলের রাতে আমার কর্তাকে ষাট টাকায় রফা করে বাড়িতে এনে পৌঁছে দিয়ে টাকার পরিবর্তেউচ্চমাধ্যমিকের ইংরেজি আর বাংলা বই চেয়েছিল আমাদের কাছে জানিনা তাকে সেইরাতে খুশি করতে পেরেছিলাম কিনা তবুও সেই অল্প বয়সী ছেলেটিকে নতমস্তকে প্রণাম করেছিলাম তার অধ্যবসায় দেখে।বাংলা ইংরেজি বইএর সঙ্গে হাতের মুঠোয় ষাট টাকা গুঁজে দিতে চেয়েছিলাম।সে নেয়নি। বলেছিল--আমি বই চাই, টাকা চাইনা'।ছাত্রীপড়ানো শিক্ষিকা আমি সেই মুহূর্তে ছেলেটিকে শিক্ষকের আসনে বসিয়েছিলাম।এত অধ্যবসায়তো কোনদিন আমার ছিলনা!!



জীবন এক জটিল আবর্ত।ভাড়া বাড়ির সামনে ঘুঘু পাখির বাসা গুলো, হলুদ কলকে ফুলের বিষাক্ত ফল, কোন এক ভাস্করের তৈরি গান্ধীজীর পাথরের মাথায় বাইতে থাকা শুঁয়োপোকা, মায়ের অসম্ভবসময়জ্ঞান, কর্তব্যনিষ্ঠা, যার সঙ্গে বাড়ির ছাদ, সুখ দুঃখ সব ভাগ করে নেই তার কাছ থেকে মাথা উঁচু করে বাঁচার লড়াই শেখা, যে ছাত্রী নাবালক বয়সে বিয়ে করে বসে বাবা মার অবহেলায়( আমায়নির্দ্বিধায় বলে -'না হলে বাঁচতাম কী করে দিদি?') আমায় শিখিয়ে দেয় এজীবনে নিজের জীবন নিজেকেই গড়ে নিতে হয়
নির্বাক শ্রোতা হয় বুঝে নিতে হয় পৃথিবীর হৃৎস্পন্দন। জীবনে ভাঙা গড়াআসে। আমরা শিখেই চলি।




  রাত বারোটার সময় আমার পৃথিবী নিঝুম হলে আমার আত্মজ যখন গলা জড়িয়ে বলে চলে --" জাপানের পতাকার লাল গোলটা আগে কোথায় ছিল, কেন কত ইঞ্চি সরে গেছে;  দোর্দণ্ডপ্রতাপ ফুটবলদলের কতরকমের জার্সি আছে, কোন দেশে কোন উড়ান প্রথম উড়ল" আমি বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে জানি  জানা আর ফুরোলো না আমি তাই  মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা শূন্য শূন্য হয়ে ক্যালেন্ডারেসেপ্টেম্বরের পাঁচ তারিখ হলে আমার  আত্মজকেই বলি--" হ্যাপি টিচার্স ডে"।


একনজরে

সম্পাদকীয়-র পরিবর্তে

"ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। ...